ভূমিকা: যা কুন্দেন্দু তুষারহারধবলা… জয় মা সরস্বতী! সনাতন ধর্মে দেবী সরস্বতী হলেন জ্ঞান, বিদ্যা, বাণী, শিল্প ও সঙ্গীতের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। প্রতি বছর মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে (যা বসন্ত পঞ্চমী নামে পরিচিত) মায়ের আরাধনা করা হয়। বিশেষ করে ছাত্রছাত্রী, শিল্পী ও জ্ঞানপিপাসুদের কাছে এই দিনটি অত্যন্ত পবিত্র। বলা হয়, শুদ্ধ মনে এবং সঠিক উচ্চারণে দেবীর মন্ত্র জপ ও অঞ্জলি দিলে জড়তা কেটে যায়, বুদ্ধি প্রখর হয় এবং বিদ্যালাভে কোনো বাধা থাকেছে না।
আজ Pujapath.net-এর এই বিশেষ পোস্টে আমরা সরস্বতী পুজোর প্রধান মন্ত্র, অঞ্জলি মন্ত্র ও প্রণাম মন্ত্রের সম্পূর্ণ লিরিক্স বাংলায় প্রদান করছি।
১. মা সরস্বতীর ধ্যান মন্ত্র (Saraswati Dhyan Mantra)
পুজোর শুরুতে মায়ের এই রূপটি মনে চিন্তা করে ধ্যান করতে হয়:
ওঁ শ্বেতপদ্মাসনা দেবী শ্বেতপুষ্পোপশোভিতা। শ্বেতাম্বরধরা নিত্যা শ্বেতগন্ধানুলেপনা॥ হংসযুক্তবিমানস্থা ব্রহ্মা বিষ্ণু শিবস্তুতা। সা মাম পাতু সরস্বতী ভগবতী নিঃশেষজাড্যাপহা॥
অর্থ: যিনি শ্বেত পদ্মে আসীন, শ্বেত পুষ্পে শোভিত, শ্বেত বস্ত্র পরিহিতা, নিত্যকাল বর্তমানা এবং শ্বেত চন্দনে অনুলিপ্তা; যিনি হংসযুক্ত বিমানে অবস্থান করেন এবং ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের দ্বারা স্তুত হন—সেই ভগবতী সরস্বতী আমার সমস্ত জড়তা (অজ্ঞানতা) দূর করে আমাকে রক্ষা করুন।
২. পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র (Saraswati Pushpanjali Mantra Bengali)
হাতে ফুল ও বেলপাতা নিয়ে ৩ বারে এই মন্ত্রটি বলে মায়ের চরণে অঞ্জলি দিতে হয়:
প্রথম অঞ্জলি মন্ত্র:
ওঁ ভদ্রকাল্যৈ নমো নিত্যং সরস্বত্যৈ নমো নমঃ। বেদ-वेদাঙ্গ-বেদান্ত-বিদ্যাস্থানেভ্য এব চ॥ এষ সচন্দন-পুষ্প-বিল্বপত্রাঞ্জলিঃ ওঁ ঐং সরস্বত্যৈ নমঃ॥
দ্বিতীয় অঞ্জলি মন্ত্র:
ওঁ সরস্বতি মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে। বিদ্যারূপে বিশালাক্ষি বিদ্যাং দেহি নমোঽস্তু তে॥ এষ সচন্দন-পুষ্প-বিল্বপত্রাঞ্জলিঃ ওঁ ঐং সরস্বত্যৈ নমঃ॥
তৃতীয় অঞ্জলি মন্ত্র:
ওঁ এষ দেব্যাঃ সরস্বত্যা অচ্চর্নায়ৈ নমো নমঃ। যথা যথা চ দেবেশ তথা তথা চ পরমেশ্বরী॥ এষ সচন্দন-পুষ্প-বিল্বপত্রাঞ্জলিঃ ওঁ ঐং সরস্বত্যৈ নমঃ॥
৩. মা সরস্বতীর প্রণাম মন্ত্র (Pranam Mantra)
অঞ্জলি দেওয়ার পর হাত জোড় করে মাথা নত করে এই মন্ত্রটি বলতে হয়:
ওঁ জয় জয় দেবি চরাচরসারে, কুচযুগশোভিতমুক্তাহারে। বীণাপস্তকধারিণি আঢ্যে, জান্নড্যবিলাসিনি দেবি নমোঽস্তু তে॥ সরস্বতি মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে। বিদ্যারূপে বিশালাক্ষি বিদ্যাং দেহি নমোঽস্তু তে॥
৪. জ্ঞান ও বুদ্ধি বৃদ্ধির জন্য ১টি বিশেষ ছোট মন্ত্র (Beej Mantra)
প্রতিদিন পড়াশোনা শুরু করার আগে ছাত্রছাত্রীরা এই ছোট বীজ মন্ত্রটি ১০ বা ২৮ বার জপ করলে দারুন ফল পায়:
মন্ত্র: ওঁ ঐং সরস্বত্যৈ নমঃ।
💡 সম্পর্কিত নিবন্ধ: এগুলোও অবশ্যই পড়ুন
৫. সরস্বতী পুজোর ১৫+ অলৌকিক লাভ ও মহিমা (Benefits)
শুদ্ধ মনে মায়ের আরাধনা এবং মন্ত্র জপ করলে নিম্নলিখিত সুফলগুলো পাওয়া যায়:
১. মেধা ও বুদ্ধি বিকাশ: দেবীর কৃপায় মেধার বিকাশ ঘটে এবং কঠিন বিষয় সহজে বোঝার ক্ষমতা বাড়ে। ২. স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি: শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা মনে রাখার ক্ষমতা ও একাগ্রতা অলৌকিকভাবে বৃদ্ধি পায়। ৩. বাণী শুদ্ধি: গলার স্বর মধুর হয় এবং গুছিয়ে ও স্পষ্টভাবে কথা বলার শক্তি জন্মায় (বাক-সিদ্ধি)। ৪. জড়তা ও অলসতা দূর: মনের ভেতরের অলসতা, ভয় এবং কুঁড়েমি ভাব কেটে যায়। 5. শিল্প ও সঙ্গীতে সাফল্য: যারা নাচ, গান, আঁকা বা অভিনয়ের সাথে যুক্ত, তাঁদের সৃজনশীলতা বহুগুণ বাড়ে। ৬. পরীক্ষায় ভয় মুক্তি: পরীক্ষার আগের মানসিক চাপ ও অহেতুক ভয় দূর হয়। ৭. মনঃসংযোগ বৃদ্ধি: চঞ্চল মন শান্ত হয় এবং এক জায়গায় মনস্থির করা সহজ হয়। ৮. কু-চিন্তা নাশ: মন থেকে সমস্ত খারাপ ও নেতিবাচক চিন্তা দূর হয়ে সাত্বিক ভাবের উদয় হয়। ৯. উচ্চ শিক্ষা যোগ: পড়াশোনার ক্ষেত্রে আসা বাধা বা আর্থিক অনটন কেটে যাওয়ার পথ তৈরি হয়। ১০. যশ ও খ্যাতি: জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে সমাজে মান-সম্মান এবং প্রতিষ্ঠা লাভ হয়। ১১. চাকরির পরীক্ষায় সফলতা: প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সফল হওয়ার আত্মবিশ্বাস বাড়ে। ১২. অহংকার দূর: বিদ্যা মানুষকে বিনয়ী করে তোলে, ফলে ভেতরের অহংকার দূর হয়। ১৩. বাস্তু দোষ খণ্ডন: পড়ার ঘরে মায়ের বন্দনা করলে সেই ঘরের সমস্ত নেতিবাচক শক্তি দূর হয়। ১৪. মানসিক স্পষ্টতা: যেকোনো সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মানসিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব কেটে যায়। ১৫. সংস্কারী জীবন: শিশুদের ছোটবেলা থেকে এই মন্ত্র শেখালে তারা সংস্কারী ও সচ্চরিত্রের অধিকারী হয়।
৬. প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
प्रश्न ১. সরস্বতী পুজোর দিন কোন রঙের পোশাক পরা উচিত? বসন্তের প্রতীক এবং মায়ের প্রিয় রঙ হিসেবে এই দিনে হলুদ বা সাদা রঙের পোশাক পরা সবচেয়ে শুভ বলে মনে করা হয়।
प्रश्न ২. পুজোর দিন কি পড়াশোনা করা যায়? শাস্ত্র মতে, বাসন্তী পঞ্চমীর দিন বই-খাতা মায়ের চরণে অর্পণ করা হয়। তাই ওই দিন পড়াশোনা থেকে বিরত থেকে সম্পূর্ণ মন মায়ের চরণে দিতে হয়। পরের দিন ‘শীতল ষষ্ঠী’ বা দধিকর্মার পর আবার বই পড়া শুরু করা নিয়ম।
प्रश्न ৩. মাকে কোন ফল নিবেদন করা আবশ্যিক? সরস্বতী পুজোয় গোটা কুল (Topa Kul), পলাশ ফুল এবং দোয়াত-কলম মায়ের সামনে রাখা অত্যন্ত জরুরি। কুল এই পুজোর প্রধান ফল।
৭. বিশেষ পরামর্শ
বিশেষ পরামর্শ: সরস্বতী পুজোর দিন অঞ্জলি দেওয়ার সময় জল না খেয়ে উপোস থাকা ভালো। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, পুজোর পর মায়ের চরণে অর্পিত বেলপাতাটি নিজের পড়ার বইয়ের ভেতরে রেখে দিলে পড়াশোনায় একাগ্রতা অনেক বৃদ্ধি পায়। আর প্রসাদ খাওয়ার সময় অবশ্যই খাগের কলম ও দোয়াতের দুধ-মধু মুখে ছোঁয়াবেন, এতে বাণীর জড়তা কাটে।
৮. উপসংহার: বিদ্যার আলোয় কাটুক অন্ধকার
মা সরস্বতীর এই পবিত্র মন্ত্রগুলো কেবল শব্দের সমষ্টি নয়, এগুলো আমাদের অন্তরের সুপ্ত চেতনাকে জাগিয়ে তোলার চাবিকাঠি। বিশ্বাসের সাথে মায়ের আরাধনা করলে অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর হয়ে জ্ঞানের আলো জ্বলে উঠবেই।
আশা করি Pujapath.net-এর এই নিখুঁত মন্ত্রের সংগ্রহ আপনার পাঠকদের উৎসবকে আরও ভক্তিপূর্ণ করে তুলবে। কমেন্টে “জয় মা সরস্বতী” লিখতে ভুলবেন না!








